ছবির ক্যানভাসে

ক্যানভাস পত্রিকা, ২০১০, কলকাতা বইমেলা সংখ্যা থেকে

‘দেয়ার ইজ নো অল্টারনেটিভ’ কিংবা ‘পড়েছ যবনের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে’—দুটো একই কথা! এটাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাবধানবাণী বা সাদা বাংলায় থ্রেট! দেশ-কাল-পৃথিবী জুড়ে চলছে চলবে আর্থিক মন্দা আর মূল্যবৃদ্ধি, লক্ষ কোটি মানুষ রাতারাতি কর্মসংস্থান আর বেঁচেবর্তে থাকার বৃত্ত থেকে বিলকুল আউট! বহুজাতিকদের হাতে দেশের জল-জঙ্গল-জমি লুঠ, শহর থেকে বস্তি হঠে যাচ্ছে-জডলে যাচ্ছে দৃশ্যমান পে-লোডার বা অদৃশ্য নেক্সাসের জোরে, আর বেশি ট্যাঁফো করলেই পুলিশী আঁচড়, ইউএপিএ-র সীলমোহর  কিংবা উর্দিধারী বা উর্দিবিহীন পুলিশের গ্রীণহান্ট অথবা সুর্যোদয়ের মত অপারেশন গরম সীসা ঢেলে দেবে প্রতিবাদীর বুকে। শ্রমের মর্যাদা রচনাটা আর বাজারী রচনা সংকলনেও পাওয়া যায় না, শ্রমিকরা ধুঁকছে বন্ধ কারখানার শবের ওপর। শপিং মল বা আবাসনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর সারতে আসছে লক্ষ লক্ষ টাকা গুনাগার দেওয়া প্রাইভেট কলেজের ছাত্রছাত্রী। এভাবে এই সমকালটাকে বর্ণনা করতে গেলে একটা নিস্তব্ধতা লাগবে? ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতার মত। ক্রমশ ফারাক বেড়ে চলেছে বিত্তবান আর বিত্তহীন, অত্যাচারী আর অত্যাচারিতের, মালিকশ্রেণী আর ব্যাপক মেহনতী জনতার। এরকম একটা সময়ে পক্ষ আমাদের নিতেই হত, আমরা তাই নিয়েছি। জমি-ইজ্জত-রুটি-রুজি-আইডেন্টিটি বা মানবাধিকার রক্ষা বা প্রসারের প্রশ্নটা তীব্রভাবে আবর্তিত হচ্ছে এই সময়টাকে ঘিরে। আমরা এহেন একটা সময়ের সহনাগরিক, এরকম সব লড়াইয়ের সহযোদ্ধা। অবশ্য এরাজ্যে ‘পরিবর্তনে’র গন্ধে ম ম করছে চারদিক, কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন কী? হালফিলের পরিবর্তনটা কী আনবে সঙ্গে করে? … থোড়বড়িখাড়া খাড়াবড়িথোড়-এর চেয়ে ভালো কোন সমাধান চর্মচক্ষুতে ধরা দেয় না। অতঃপর আবার হাতে রইলো রাসা। স্ব??, বিশ্বাস আর প্রত্যয়ের রাসা? পরিবর্তনের সত্যিকারের সূর্য অভিযানের দিকে।

প্রতিবাদ-প্রতিরোধে কলম ধরে কেউ, কেউ অস্ত্র। বুক চিতিয়ে ব্যারিকেড গড়ে মানুষ শোষণ-জুলুম-অসাম্যের বিরুদ্ধে। আমরা, যারা ‘ক্যানভাস’ করছি বা আরো সমমনস্ক যারা এই সময়ে দাঁড়িয়ে নানারকম তথ্যচিত্র বানাচ্ছি, আমাদের একটা সাদৃশ্যের বাঁধুনি আছে। এই বইটা এরকম বেশ কয়েকজনের উৎসাহ আর সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল। এই যে আমরা— মিছিলের স্লোগান, দেওয়াল জুড়ে লেখা, পোস্টার-লিফলেট-পত্রিকা, চোঙা ফুঁকে বক্তৃতার সাথেই বেশী অভ্যস্ত, হাত থেকে হাতে বুক থেকে বুকে দিনবদলের ইস্তাহার ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে ব্রতী আর তাই আর পাঁচটা মাধ্যমের সাথে আমরা বেছে নিয়েছি এই তথ্যচিত্র বা ডকুমেন্টারী কিংবা টুকরো টুকরো বিকল্প খবর বানানোর মাধ্যমটাকে। নিরপেক্ষতা একটা কঠিন শব্দ, এরকম বেআক্কেলে সময়ে আমরা তাই তার ধার ধারিনি। পক্ষপাত আমাদের একটা আছে— সেটা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্ছেদ চাই আমরা। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ নামক সংগঠিত মানুষমারা ব্যবস্থাটা বদলে দিয়ে একটা অন্য সমাজ চাই আমরা। আমাদের, আমাদের বন্ধুদের ছবিগুলো সেই লক্ষ্যেই।

সেই লক্ষ্যেই হ্যান্ডিক্যামে ছবি তোলা, বাড়িতে বসে এডিট করে, যা যা বলতে চাই, দেখাতে চাই জুড়ে দিয়ে একটা ডকু বানিয়ে তারপর প্রজেক্টর দিয়ে সেই ছবি জমজমাট রাস্তায় পর্দা টাঙিয়ে, স্কুল-ক্লাবঘরে ব্ল্যাকবোর্ডের ওপর সাদা আর্টপেপার সেঁটে বা নিতান্তই গাঁয়ের বাড়ির মাটির দেওয়ালে মানুষের সামনে দেখিয়ে ফেলা। প্রতিবন্ধকতা অনেক। তবু অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়ার প্রভাব কতটা ব্যাপক হতে পারে, তা তো আমরা গত কয়েক বছরে টের পেয়েছি, তাই চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মিডিয়া ব্যুমের যে কালপর্বের মধ্যে দিয়ে আমরা চলছি, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব তো অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়ার। এবং তার সর্বত্রগামিতা, সহজলভ্যতা তথা সর্বজনগ্রাহ্যতা আরও সহজ করেছে মিডিয়ার জয়যাত্রাকে। ছাপার অক্ষরের বেদবাক্য এখন তার জয়পতাকা হস্তান্তর করে দিয়েছে অডিও-ভিস্যুয়ালের লাইভ দেখার কাছে। তাকে অস্বীকার করাই খুব কঠিন।

ভিডিও অ্যাক্টিভিজম সমাজের হেজিমনির বিরুদ্ধে কোন হাতিয়ার হতে পারে কিনা— এ নিয়ে বিতর্কটা অনেকদিনের। আমরা প্রযুক্তির সাহায্য নিলে, শাসকরা একশো গুণ প্রযুক্তির সাহায্য নেবে। আমরা এই কাজের জন্য চেয়েচিন্তে এক টাকা ঢাললে, মালিকশ্রেণীর লোকেরা একশো টাকা ঢালবে। এটা কেউ স্পষ্ট বুঝতে পারলে তাকে অন্তত প্রশ্ন করতে শিখতে হবেই কর্পোরেট বা সরকারী উদ্যোগগুলিকে। হাজারো কেবল চ্যানেল আছে, কোনটাই জনগণের উদ্যোগে চলে না, চলে পুঁজি খাটানো মালিকের পয়সায়। লক্ষ ছবি তৈরী হয়, এক-দুটো বাদে সবই কোনো না কোনো হোমড়াচোমড়া প্রডিউসার  ফিনান্স করে। ফলে যে মালিক-কর্পোরেট-পুঁজিপতিরা গোটা দুনিয়াকেই কিনে নিতে চান, তারা যে এরকম চ্যানেলগুলোকে বা ছবিগুলোকে বা তাদের বানানেওয়ালাদের কিনতে চাইবে, কিনতে চাইবে সব দক্ষতাগুলোকে, তাতে আর আশ্চর্য কি?

আমাদের শুধু প্রশ্ন করতে হবে, তাদের নিরপেক্ষতার ভেককে। ঐ সরকারী বা কর্পোরেটদের নিরপেক্ষতা নেই, থাকার প্রশ্নও নেই। আর তাই আমাদেরও নিরপেক্ষতা নেই, আমরা কায়েমী স্বার্থের অবসান চাই। আর তাই একাজ করতে গেলে সরকারী অনুগ্রহ, কর্পোরেটদের ফান্ড বা এনজিওদের অনুদান পরিত্যাগ করে চলতে হবে। এনজিওদের কথা বললাম কারণ তারা সমাজের আমূল বদলের কোনো দিশা দেখে না, দেখায়-ও না, তাই প্রতিবাদ করে বড়জোর, প্রতিরোধ করে না। তাই কানাগলিতে হারিয়ে যাওয়ার বদলে আমরা বরং থাকবো প্রতিরোধের ব্যারিকেডেই— কখনো ক্যামেরা, কখনো প্রজেক্টর, কখনো ঝান্ডা, কখনো বা শুধুই মুষ্টিবদ্ধ হাত আমাদের অস্ত্র। আমরা সাহায্য পাচ্ছি বহু মানুষের। আমরা তার জন্য কৃতজ্ঞ। আমরা বন্ধু পাচ্ছি অনেক। আমরা আশাবাদী তা নিয়ে। আসুন, হাতে হাত ধরে পার হবই এই বিষের বিষাদসিন্ধু।

About activistcanvas

We are activist film makers based in West Bengal, India. We make independent films on socio-political issues.

Posted on 14-Feb-10, in Uncategorized. Bookmark the permalink. Comments Off on ছবির ক্যানভাসে.

Comments are closed.

%d bloggers like this: